তরল পদার্থের বাষ্পীভবন নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “অটোমোবিল ইঞ্জিনিয়ারিং” বিভাগ এর “ফুয়েলস এন্ড লুব্রিক্যান্টস” বিষয়ের একটি পাঠ। যে তরল পদার্থ যে তাপমাত্রায় ফুটতে আরম্ভ করে তাকে ঐ তরল পদার্থের স্ফুটনাঙ্ক বলে। কিন্তু তরল বাষ্পে পরিণত হওয়ার প্রবণতাকে বাষ্পীভবন বলে। যে তরল পদার্থ যত কম তাপমাত্রায় বাষ্পে পরিণত হয় সে তরল পদার্থে বাষ্পীয়ভবন তত বেশী এবং স্ফুটনাঙ্কও তত কম। তদ্রূপ যে তরল পদার্থ বাষ্পে পরিণত হতে যত বেশী তাপমাত্রার প্রয়োজন হয় তার বাষ্পীয়ভবন ক্ষমতা তত কম এবং স্ফুটনাঙ্ক তত বেশী ।
তরল পদার্থের বাষ্পীভবন

ইহা পরিষ্কারভাবে বলা যায়, যে তরল পদার্থের স্ফুটাঙ্ক যত বেশী সে তরল পদার্থের বাষ্পীয়ভবন ক্ষমতা তত কম। আবার যে তরল পদার্থের স্ফুটনাঙ্ক যত কম উহার বাষ্পীভবন তত বেশী। মোটরযানে জ্বালানি হিসেবে গ্যাসোলিন ব্যবহার করা হয়। এই জ্বালানিতে বাষ্পীয়ভবন প্রবণতা বিদ্যমান থাকে বিধায় কোন কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে জ্বালানি সরবরাহ লাইনে (Fuel line) বাষ্পের বাঁধন (vapour lock) সৃষ্টি হয়। ফলে স্বাভাবিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। এর ফলে ইঞ্জিনের শক্তি উৎপাদন হ্রাস পায়।
বাষ্পের বাঁধন বেশী হলে জ্বালানি সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বাষ্পের বাঁধন বিভিন্ন কারণে হতে পারে, যেমন— (ক) ইঞ্জিন বেশী গরম হলে, (খ) জ্বালানি তেলে বাষ্পীভবন ক্ষমতা বেশী থাকলে, (গ) জ্বালানি সরবরাহ লাইনে তাপ লাগলে, (ঘ) জ্বালানি সরবরাহ লাইনে চাপ কমে গেলে, (ঙ) অধিকক্ষণ প্রখর রোদে থাকার ফলে কারবুরেটর, ফুয়েল পাম্প ও ট্যাঙ্ক গরম হলে।
জ্বালানি তেলে বাষ্পীভবন :
সঠিক পরিমাণে থাকলে জ্বালানি সরবরাহ লাইনে বাষ্পের বাঁধন হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। তেলে বাষ্পীভবন প্রবণতা বেশী থাকলে বাষ্পীভবন বাঁধন বেশী হয় এবং কম থাকলে বাধন কম হয়। কাজেই জ্বালানি তেলের বাষ্পীভবন ক্ষমতা সঠিক পরিমাণে থাকা বাঞ্ছনীয়। কারণ কম থাকলে ইঞ্জিন চালু হবে না। জ্বালানি তেলকে বাষ্পীয় বাঁধন মুক্ত করার জন্য বাষ্পীয় চাপ পরীক্ষা করতে হয়।
জ্বালানি তেলের বাষ্পীয় চাপ পরীক্ষা (Vapour pressure test of fuel) :
জ্বালানি তেলের বাষ্পীয় চাপ এমন হওয়া উচিত যেন ইঞ্জিন সহজে চালু হতে পারে। কিন্তু ইঞ্জিন কার্যকর তাপমাত্রায় পরিচালিত হওয়ার সময় বাষ্পীয় বাধার সৃষ্টি না হওয়া বাঞ্ছনীয়। জ্বালানি তেলের বাষ্পীয় চাপ বৃদ্ধি নির্ভর করে তাপমাত্রা বৃদ্ধির উপর এবং তেলের উপাদানের উপর। রীড বাষ্পীয় চাপ (Reid vapour pressure) যন্ত্রের সাহায্যে জ্বালানি তেলের বাষ্পীয় চাপ নির্ণয় করা যায়। রীড বাষ্পীয় চাপ যন্ত্রে নমুনাস্বরূপ যতটুকু জ্বালানি তেল নেওয়া হয় তার চারগুণ বাতাস বায়ু প্রকোষ্ঠে নিয়ে এই পরীক্ষা করা হয় (১৬.২৬ ও ১৬.২৭ চিত্র দ্রষ্টব্য)।

এই পরিমাপক যন্ত্রের সাহায্যে পরীক্ষা করার জন্য ১০০ মিলিলিটার জ্বালানি তেল যন্ত্রের জ্বালানি প্রকোষ্ঠে রাখতে হয়। তারপর জ্বালানি-প্রকোষ্ঠটি ১০০° ফাঃ তাপমাত্রার পানিতে ডুবিয়ে দিতে হয়। এর ফলে জ্বালানি তেলের যে অংশ বাষ্পে পরিণত হয় তার চাপ বায়ু- প্রকোষ্ঠে অনুভূত হয়। বায়ু-প্রকোষ্ঠের সাথে একটি চাপ পরিমাপক গেজ সংযুক্ত থাকে। সেটি বাষ্পের উক্ত চাপ নির্দেশ করে।
রীড-পরীক্ষা জ্বালানি তেলের প্রাথমিক বাষ্পীয় চাপের প্রবণতা নির্দেশ করে। শীতকালের জন্য ঐ চাপের সর্বোচ্চ সীমা হচ্ছে ১২ পাঃ প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে। গ্রীষ্মকালের জন্য ঐ চাপের পরিমাণ হচ্ছে ৯ পাঃ প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে অথবা তার চেয়ে কিছু কম। ঐ চাপের সাধারণ মান হচ্ছে ৭ পাউণ্ড প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে। বিমানের জন্য ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের বাষ্পীয় চাপমাত্রা হচ্ছে ৭ পাউণ্ড প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে। যেহেতু ঊর্ধ্বাকাশে চাপ কমে যায় সেহেতু বাষ্পীয় চাপের প্রবণতা বৃদ্ধি পায় ।

আঠা (Gum) :
জ্বালানি তেল আঠার উপস্থিতি অপ্রত্যাশিত। আঠা নানাভাবে ইঞ্জিনের ক্ষতি করতে পারে, যেমন— (ক) ইঞ্জিনে ধোঁয়া বেশী হয়, (খ) ভাল্ভ এবং পিস্টন রিং-এ কার্বন বেশী পড়ে এবং আঠা জমাটবদ্ধ হয়ে যায়, (গ) ইঞ্জিন হেডে কার্বন জমে, (ঘ) একজস্ট মেনিফোল্ডে কার্বন বেশী জমে, (ঙ) কারবুরেটরের জেটসমূহ তাড়াতাড়ি জমাটবদ্ধ হয়ে যায়, (চ) ইঞ্জিন পাম্পে তলানি বেশী জমে, ফলে লুব অয়েল (mobile) তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়।
বিভিন্ন কারণে তেলে আঠার সৃষ্টি হয়। আঠার মূল উপাদান হচ্ছে জৈব অ্যাসিড। সদ্যপ্রস্তুত জ্বালানি তেলে আঠা কম থাকে। জ্বালানি তেল বেশীদিন সংরক্ষিত থাকলে আঠা বেশী জমে। আঠা জমার মূল কারণ হচ্ছে, (ক) অক্সিজেনের সংস্পর্শে বেশী আসা, (খ) বেশীদিন সূর্যের আলো তেলের সংস্পর্শে আসা, (গ) তাপমাত্রা বেশী হওয়া এবং (ঘ) বেশীদিন তেলের সাথ ধাতব পদার্থের সংশ্রব ঘটা। পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ন্যাপথিন, প্যারাফিন ও অ্যারোমেটিক পরিবারের স্থিতিস্থাপক হাইড্রোকার্বনসমূহে আঠা কম সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে ক্র্যাকড প্যাসোলিনে আঠা বেশী জমে।

৩ thoughts on “তরল পদার্থের বাষ্পীভবন”